শহরের কোলাহল থেকে দূরে, উত্তরবঙ্গের এই ছোট্ট গ্রামটায় যখন অঞ্জন পা রাখল, তখন বিকেল ফুরিয়ে আসছে। চারপাশটা কেমন যেন থমথমে, আর চৈত্র মাসের এই সময়েও বাতাসে এক অদ্ভুত হিমেল ভাব। কুয়াশা সাধারণত শীতকালে হয়, কিন্তু এই গ্রামটার চারপাশে হালকা একটা ধোঁয়াটে পর্দা সবসময় যেন ঝুলে থাকে। স্থানীয় মানুষজন একে বলে ‘মায়ার কুয়াশা’।
অঞ্জন তার কাঁধের ক্যামেরাটা ভালো করে চেপে ধরে গ্রামের একমাত্র প্রাচীন জমিদার বাড়িটার দিকে এগিয়ে চলল। বাড়িটার সিংহদুয়ার ভাঙা, দেয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ। লোকমুখে শোনা যায়, প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই বাড়ির শেষ জমিদার এক রাতে তাঁর সমস্ত ধন-সম্পদসহ হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন। কেউ বলে তিনি খুন হয়েছিলেন, কেউ বলে কোনো গুপ্ত সুড়ঙ্গ দিয়ে তিনি অন্য কোথাও চলে যান। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই রহস্যের জট খোলেনি।
অঞ্জন যখন ক্যামেরাটা চোখে লাগিয়ে ভাঙা জানালার একটা শট নিতে যাবে, ঠিক তখনই লেন্সের ভেতর দিয়ে সে দেখতে পেল—ভেতরের অন্ধকার ঘরের এক কোণে একটা আবছা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। আর তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয়, সেই অবয়বটির হাতে জ্বলছে একটি প্রাচীন লণ্ঠন!
অঞ্জন ক্যামেরা নামিয়ে চোখ রগড়ে আবার তাকাল। এবার সেখানে কিচ্ছু নেই, কেবল শূন্যতা। কিন্তু ক্যামেরার ডিজিটাল স্ক্রিনে যখন সে শেষ তোলা ছবিটা দেখল, তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। ছবিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, অন্ধকার ঘরের মেঝেতে একটা নতুন মাটির পাত্র রাখা, আর তার পাশে পড়ে আছে একটা প্রাচীন পিতলের চাবি।
অঞ্জন আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধকধকানিটা বেড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের অ্যাডভেঞ্চারের নেশাটা তাকে টেনে নিয়ে চলল সেই ভাঙা সিংহদুয়ারের দিকে। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ তুলে সে ভেতরে ঢুকল।
চারপাশে একটা ভ্যাপসা, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ঠিক যে ঘরটার জানালার দিকে সে ক্যামেরা তাক করেছিল, সাবধানে পা টিপে টিপে সেদিকে এগিয়ে গেল। ঘরটায় ঢুকতেই কুয়াশার একটা হালকা স্তর তাকে ঘিরে ধরল, অথচ ঘরের ভেতরে কুয়াশা থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই!
অঞ্জন পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বলাল। আলোর তীব্র রশ্মিটা গিয়ে পড়ল ঘরের ঠিক মাঝখানটায়। ক্যামেরার স্ক্রিনে যা দেখেছিল, অবিকল তাই! মেঝেতে একটা নতুন মাটির পাত্র, আর তার ঠিক পাশেই পড়ে আছে সেই ভারী, প্রাচীন পিতলের চাবিটা।
চাবিটা হাতে তুলে নিতেই অঞ্জন চমকে উঠল। চাবিটা অসম্ভব ঠাণ্ডা, যেন বরফ মেশানো পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল। ঠিক তখনই তার পায়ের নিচের মেঝেটা কেঁপে উঠল। একটা ভারী পাথর সরে যাওয়ার কর্কশ শব্দ হলো ঘরের এক কোণে।
অঞ্জন আলোর উৎসটা সেদিকে ঘোরাতেই দেখল, দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা একটা বিশাল আলমারি নিজে থেকেই একপাশে সরে গেছে। আর তার পেছনে উঁকি দিচ্ছে অন্ধকার এক সুড়ঙ্গের মুখ! সেই সুড়ঙ্গ বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে পাথরের সিঁড়ি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একটা মৃদু আলো আর ধূপের সুগন্ধ ভেসে আসছে।
অঞ্জন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেন এক সম্মোহনের ঘোরে সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। চাবিটা তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা।
সিঁড়ি বেয়ে প্রায় তিরিশ ফুট নিচে নামার পর সে একটা বিশাল ভূগর্ভস্থ কক্ষে এসে পৌঁছাল। সেখানে চারদিকের দেয়ালে মশাল জ্বলছে—যা এই যুগের কোনো মানুষের পক্ষে জ্বালানো অসম্ভব! ঘরের ঠিক মাঝখানে পাথরের একটা বেদির ওপর রাখা আছে একটি কারুকার্য খচিত কাঠের বাক্স বা সিন্দুক। সিন্দুকের গায়ে ঠিক অঞ্জনদের হাতের চাবিটার মাপের একটি চাবির ছিদ্র।
কিন্তু অঞ্জন সিন্দুকের দিকে পা বাড়াতেই এক অদ্ভুত খসখস শব্দে থমকে দাঁড়াল।
বেদির ঠিক পেছন থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক বৃদ্ধ মানুষ। তার পরনে প্রাচীনকালের রক্ষীদের মতো পোশাক, চুল-দাড়ি ধবধবে সাদা, আর চোখ দুটোয় কোনো মণি নেই—একেবারে কুয়াশার মতো সাদা!
বৃদ্ধটি অঞ্জনকে দেখেও একটুও অবাক হলো না। বরং এক অদ্ভুত গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "পঞ্চাশ বছর ধরে আমি এই চাবির অপেক্ষা করছি। কিন্তু মনে রেখো যুবক, এই সিন্দুক কেবল ধন-সম্পদ আগলে রাখেনি, এর ভেতরে বন্দি আছে এই গ্রামের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। সিন্দুক খুললে তুমি হয়তো অঢেল সোনা-দানা পাবে, কিন্তু এই অভিশাপও মুক্ত হয়ে যাবে। এখন সিদ্ধান্ত তোমার—তুমি কি চাবি ঘোরাবে, নাকি ফিরে যাবে?"
অঞ্জন এখন এক চরম ধর্মসংকটে! এরপর সে কী করবে?
অঞ্জন চট করে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাইল না। সে বুঝতে পারল, শুধু সাহস দিয়ে এই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া যাবে না, এখানে বুদ্ধির প্রয়োজন। সে হাতের চাবিটা আরও শক্ত করে ধরে এক পা পিছিয়ে এল, কিন্তু তার চোখ রইল সেই মণিহীন সাদা চোখের বৃদ্ধের দিকে।
অঞ্জন গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বেশ শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "আমি এখানে কোনো ধন-সম্পদের লোভে আসিনি। আমি এসেছি সত্যের সন্ধানে। আপনি পঞ্চাশ বছর ধরে যার অপেক্ষা করছেন, সে আমি নই, হয়তো এই চাবিটা। কিন্তু সিন্দুক খোলার আগে আমি জানতে চাই—কী সেই অভিশাপ? আর পঞ্চাশ বছর আগে এই জমিদার বংশের শেষ মানুষটার ঠিক কী হয়েছিল?"
বৃদ্ধের পাথুরে মুখে সামান্য একটু বিস্ময়ের রেখা ফুটে উঠল। সে হয়তো ভেবেছিল আর সবার মতো এই যুবকও সিন্দুক দেখেই চাবিটা গর্তে ঢুকিয়ে দেবে। বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আর সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে ঘরের মশালগুলো যেন একটু কেঁপে উঠল।
বৃদ্ধ বলতে শুরু করল, "তবে শোনো। পঞ্চাশ বছর আগে এই জমিদার বাড়ির শেষ পুরুষ, জমিদার মহিম রঞ্জন ছিলেন এক নিষ্ঠুর ও লোভী মানুষ। তিনি এই গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করে এক বিশাল গুপ্তধন জড়ো করেছিলেন। কিন্তু তার লোভের শেষ ছিল না। তিনি এক তান্ত্রিকের সাহায্যে এই সিন্দুকে এক কাল-শক্তির আহ্বান করেন, যা তাকে অমরত্ব দেবে এবং তার সম্পদকে চিরকাল রক্ষা করবে।"
বৃদ্ধ একটু থামল, তারপর সুড়ঙ্গের ভেতরের কুয়াশার দিকে তাকিয়ে বলল, "কিন্তু তান্ত্রিকের দেওয়া শর্ত মহিম রঞ্জন মানেননি। ফলে সেই কাল-শক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে পুরো জমিদার বংশকে এক রাতেই এই কুয়াশার ভেতর বিলীন করে দেয়। আর মহিম রঞ্জন? তিনি মরেও মরতে পারেননি। তিনি এই সিন্দুকের ভেতরেই এক জীবন্ত লাশ হয়ে বন্দি আছেন। এই চাবিটা হলো তাঁর মুক্তির চাবি। সিন্দুক খুললে ধন-সম্পদ নয়, মহিম রঞ্জনের সেই অতৃপ্ত আত্মা আর কাল-শক্তি মুক্ত হয়ে এই পুরো গ্রামকে ধ্বংস করে দেবে।"
অঞ্জন এবার বৃদ্ধের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে আপনি কে? আর এই চাবিটাই বা বাইরে গেল কীভাবে?"
বৃদ্ধ এক রহস্যময় হাসি হেসে বলল, "আমি এই বাড়ির শেষ বিশ্বস্ত দেওয়ান। আমার আত্মা এই অভিশাপের পাহারাদার। আর চাবিটা? মহিম রঞ্জনের প্রেতাত্মা প্রতি পঞ্চাশ বছর পর পর এই চাবিটাকে কুয়াশার মায়ায় বাইরে পাঠায়, কোনো লোভী মানুষকে ভেতরে টেনে আনার জন্য। আজ তুমি সেই মায়ায় পড়েছ।"
অঞ্জন পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারল। ক্যামেরার লেন্সে দেখা লণ্ঠন হাতে অবয়বটা আসলে মহিম রঞ্জনের আত্মারই এক চাল ছিল, যাতে অঞ্জন চাবিটা খুঁজে পায়।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠতে লাগল। সিন্দুকের ভেতর থেকে একটা ছটফটানির শব্দ শোনা গেল, যেন ভেতরের বন্দি জিনিসটা বুঝতে পেরেছে যে তার রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে! সিন্দুকের গা থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে শুরু করল এবং তা চাবির ছিদ্র দিয়ে অঞ্জনের হাতের চাবিটাকে এক অদৃশ্য শক্তিতে টেনে নিতে চাইল।
অঞ্জনের হাত সিন্দুকের দিকে এগোতে লাগল, সে নিজের শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে! বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠল, "যুবক! নিজের মনকে শক্ত করো! ও তোমাকে সম্মোহিত করছে! চাবিটা সিন্দুকে ঢুকলেই সব শেষ!"
অঞ্জন এখন কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে?
অঞ্জনের হাতের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল। চাবিটা সিন্দুকের অদৃশ্য আকর্ষণে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে যাচ্ছে। সিন্দুকের ভেতরের ছটফটানি আর খসখস শব্দ এখন এক বীভৎস অট্টহাসিতে রূপ নিয়েছে। বাতাস এত ভারী হয়ে উঠেছে যে অঞ্জনের দম আটকে আসার উপক্রম।
কিন্তু অঞ্জন সাধারণ কোনো পর্যটক নয়, তার মনের জোর অসীম। সে বুঝতে পারল, একবার চাবিটা সিন্দুকের ছিদ্রে স্পর্শ করলে আর কোনো উপায় থাকবে না। লোভের এই ফাঁদকে চিরতরে ধ্বংস করতে হবে।
"না! এই অভিশাপ আমি মুক্ত হতে দেব না!"—বলেই অঞ্জন তার সমস্ত শারীরিক ও মানসিক শক্তি এক জায়গায় জড়ো করল। সিন্দুকের আকর্ষণের বিপরীত দিকে নিজের হাতটাকে টেনে এনে, পুরো শরীরের ভর দিয়ে সে প্রাচীন পিতলের চাবিটা ছুঁড়ে মারল সুড়ঙ্গের সেই পাথুরে দেয়ালের ওপর।
ঝনঝন!
এক প্রচণ্ড শব্দে চাবিটা দেয়ালে ধাক্কা খেল। পঞ্চাশ বছরের পুরনো এবং বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে থাকা পিতলটি সেই তীব্র আঘাত সহ্য করতে পারল না। ওটা মাঝখান থেকে দুই টুকরো হয়ে মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
চাবিটা ভাঙার ঠিক পরের মুহূর্তেই সিন্দুকের ভেতর থেকে এক বুকফাটা আর্তনাদ ভেসে এল। সিন্দুকের চারপাশ থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়াগুলো মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে মিলিয়ে গেল। ঘরের মশালগুলো দপ করে নিভে গিয়ে কেবল মোবাইল ফ্ল্যাশের আলোটা অবশিষ্ট রইল।
অঞ্জন হাঁপাতে হাঁপাতে দেখল, সিন্দুকটি এখন এক সাধারণ কাঠের বাক্সে পরিণত হয়েছে, তার ভেতরের সেই অশুভ স্পন্দন সম্পূর্ণ স্তব্ধ। সে যখন বৃদ্ধ দেওয়ানের দিকে তাকাল, দেখল বৃদ্ধের সাদা চোখ দুটোয় এখন এক অদ্ভুত শান্তি। বৃদ্ধের শরীরটা আস্তে আস্তে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যেতে যেতে শেষবারের মতো বলল, "ধন্যবাদ যুবক... আজ থেকে এই গ্রাম আর আমার আত্মা—সব মুক্ত হলো।"
পরদিন সকালে যখন সূর্য উঠল, তখন গ্রামের সেই চেনা ‘মায়ার কুয়াশা’ আর কোথাও ছিল না। চৈত্র মাসের মিষ্টি রোদে পুরো গ্রামটা ঝলমল করছিল।
অঞ্জন যখন তার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে গ্রামের সীমানা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন সে একবার পেছনে ফিরে তাকাল। দূর থেকে সেই পুরনো জমিদার বাড়িটাকে এখন আর অতটা ভয়ানক লাগছে না, যেন এক দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্ন শেষে ওটাও শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।
অঞ্জন তার পকেটে হাত দিল। সেখানে চাবির ভাঙা একটা টুকরো এখনও রয়ে গেছে। কোনো গুপ্তধন সে পায়নি ঠিকই, কিন্তু তার ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে আর মনে রয়ে গেল এমন এক সত্য, যা পৃথিবীর আর কেউ কোনোদিন জানবে না।




