views your Language

রবিবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৬

মূল্যবান কোনটা বই না জুতা!?

আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগের ঘটনা। আজিজার রহমানের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল। কোন কারনে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হলে দ্বিতীয় বিয়ে করতে হয়। প্রথম স্ত্রীর দুইটা মাত্র পুত্র সন্তান ছিল। দ্বিতীয় বিয়ে করার পরে সেই স্ত্রীর আরও তিনটি ছেলে সহ দুই মেয়ে মোটের উপর তারা ছিল ৫ ভাই দুই বোন। তাদের মধ্যে প্রথম স্ত্রীর দ্বিতীয় পুত্র ও দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম পুত্র ছিলেন যথাক্রমে আবুজার, সফিয়ান। আবুজারের দ্বিতীয় পুত্র ও সফিয়ানের প্রথম পুত্র দুজনেই সমোবয়সি, দুজনেই একই স্কুলে এবং একই ক্লাসে পড়াশুনা করে। এবার দুজনেই প্রাইমারী পাস করেছে। সফিয়ান ছিল একটা মাদ্রাসার শিক্ষক আর আবুজার ছিল অভাবি মৌসুমি ব্যবসায়ি ও কৃষক। দুজনেই প্রাইমারী পাশ করার পর সফিয়ানের ছেলে সামিম শহরের সরকারি হাই স্কুলে ভর্তি হলো আর আবুজারের ছেলে রুবেল গ্রামের একটি  নতুন হাই স্কুলে ভর্তি হলো। সামিমের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বই কেনা হয়েগেছে, কিন্তু রুবেল তখনো বই কিনতে পারেনি। স্কুলে ক্লাস হচ্ছে কিন্তু বই এর কারনে রুবেল ঠিক মতো পড়াশুনা করতে পারছে না। একারনে রুবেল তার বাবা-মা কে বই এর জন্য চাপ দেয়, কিন্তু যেখানে অভাবের কারনে একবেলে ভাতই জোটেনা  সেখানে কিভাবে রুবেলের বাবা-মা তাকে বই কিনে দেয়। রুবেলের দাদা ছিলেন অনেক ধনী মানুষ। রুবেল এভাবে বাবা-মা কে বইয়ের জন্য চাপদিলে একদিন তার বাবা বল্লো তোর দাদাকে বল বই কিনে দিতে। কিন্তু রুবেল সাহস করে তার দাদাকে বইয়ের কথা বলতে পারেনা। তার দাদা ছিলেন প্রচন্ড রাগি ও বদমেজাজি এবং সেই সাথে খুবেই কৃপণ। এভাবে কয়েক দিন চলার পর রুবেলের বাবা বলে বইয়ের কথা কি বলেছিছ? রুবেল বলে না! রুবেলের বাবা আবুজার এখন তাকে অনেক কথা শুনায়। সেদিন বিকেলে রুবেল সাহস করে তার দাদাকে
বইয়ের কথা বলে। তখন দাদা তাকে বইয়ের লিস্টটা দিতে বলে।
পরের দিন রুবেল তার দাদাকে বইয়ের লিস্টটা দিয়ে আসে। এভাবে আরও বেশ কয়েক দিন কেটে যায় কিন্তু বই আর আসেনা। এভাবে চলার পর একদিন রুবেল আবার তার দাদাকে বইয়ের কথা বলে, দাদা সেদিন বলে ঠিক আছেরে আমার মনে ছিল না কালকে বই এনে দেব। সেদিনের মতো রুবেল বাড়িতে এসে উল্লাসিত হয় কালকে নতুন বই পাবে বলে। পরের দিন বিকেলে আবার দাদার কাছে যায় বই আনতে আর মনে মনে সে অনন্দিত হয় নতুন বইয়ের আশায়। কিন্তু সেদিনো তার আশা ভঙ্গ হয়। দাদা বলে বইয়ের লিস্টটা খুজে পাচ্ছি না মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি। কালকে আবার বইয়ের লিস্টটা এনে দিস কালকেই এনে দেব। পরেরদিন আবার রুবেল স্কুলে গেল তখন প্রায় প্রথম সাময়িক পরীক্ষা এসেগেছে। স্যারের কাছে গেল বুক লিস্ট নিতে তখন স্যার রুবেল কে বকাঝকা করলো এখনো বই না নেয়ার কারনে। অবশেষে বুক লিস্ট নিয়ে রুবেল বাড়ী এসে সাথে সাথেই তার দাদাকে বইয়ের লিস্ট ও স্যারের অপমানের কথা বলে দাদাকে তারাতারি বই আনতে বল্লো। দাদা তখন তাকে আশ্বাস দিল কালকেই এনে দিবে। কিন্তু কাল আর হয় না!
এদিকে আবার রুবেল তার বাবা-মে চাপ দিতে থাকে কিন্তু উল্টো তার বাবা-মা তাকেই মারধোর করে,নিজের দাদার কাছে একসেট বই নিতে না পারার কারনে। এভাবে আরও বেশ কয়েক দিন চলে যায় কিন্তু বই আর আসেনা। এবার প্রায় প্রতিদিন বইয়ের আবদার নিয়ে রুবেল তার দাদার কাছে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাদা প্রতিদিন রুবেলের কাছে পা টিপে দেয় বইয়ের আশায়।তারপরও বই আসেনা। একদিন রুবেলকে তার বাবা বই নিতে না পারার কারনে প্রচুর মারে। সেদিনও দাদাকে বইয়ের কথা বলে আবার কালকের কথা বলে। আবার পরেরদিন কালকের কথাবলে এভাবে প্রায় প্রতিদিন বলতে থাকে।এরই ফাঁকে রুবেলের চাচাতো ভাই সামিম তাঁর দাদাকে বলে দাদা আমিতো সরকারি স্কুলে পড়ি প্রতিদিন জুতা পরে স্কুলে না গেলে স্যারেরা মারে তাই আমাকে একজোড় জুতা কিনে দেন। সেদিন আবার রুবেল বইয়ের কথা বলে। বলার পরেই রুবেলকে তার দাদা কয়েকটা থাপ্পোর মারে এতে রুবেলের গাল ফেটে রক্ত পরে। সেটা দেখে রুবেলের বাবা আবার রুবেলকে লাঠিদিয়ে পেটায়। রুবেলের বাবা মনে করে তার বাবার সাথে (রুবেলের দাদা) খারাব আচোরন করেছে। সেদিন রাতে রুবেলের প্রচন্ড জ্বর আসে। পরের দিন রুবললের দাদ শহরে যাবে সেটা জানতে পেরে রুবেলের মা তাকে বলে এই সময় তোর দাদাকে বল্লে মনে থাকবে আর বই নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু রুবেল তার দাদাকে আর বলবে না। জোড়াজুড়ির পর যখন দাদা প্রায় রাস্তায় তখন গিয়ে বইয়ের কথা বলেই চলে এলো। বিকেলে দাদা বাড়ী আসার পরেই রুবেল তার দাদার ঘরে গেল গিয়েই দেখতে পায় সেখানে সামিম ছাড়াও অন্য ভাই-বোনেরাও আছে। রুবেল গিয়ে দেখে কারও জন্য কিছু না আনার জন্য সবাই মন খারাব করেছে আর সামিম একজোড়া জুতা নিয়ে নেড়েচেরে দেখছে। রুবেল ভাবলো সামিমের জন্য যেহেতু জুতা এনেছে তখন অবশ্যই তার জন্যও বই এনেছে। সামিমকে দাদা বল্লো তোর জুতা পছন্দ হয়েছে? সামিম হসিঁ মূখে বল্লো হ্যাঁ, তখন দাদা তাকে বল্লো এখন জুতা নিয়ে যা। সামিম চলে গেল। এবার রুবেল বল্লো দাদা বই? দাদা বল্লো দ্বারা, পা টা একটু টিপে দে! রুবেল ভাবলো দাদা মনেহয় বই এনেছে। তাছাড়া দাদা জানে কেউ তার ঘরের কাছ দিয়ে হেটে যায় না পা টিপে দিতে বলবে বলে। রুবেল ভাবছে দাদা মনেহয় বুঝেগেছে আজকে বই দিলেতো রুবেলও আর ঘরের কাছদিয়ে হাটবেনা। সেদিন রুবেলল বই পাওয়ার আনন্দে গাঁয়ে জ্বর নিয়েও আনেক্ষণ পা টিপে দিল। পা টিপে নিতে নিতে দাদা ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু তখনো রুবেল বই পাওয়ার আশায় পা টিপেই চলছে। এরই মধ্যে রুবেলের মা তাকে খুজতে আসে, রুবেল দাদার ঘরে আছে দেখে তার মাও ভাবলো আজ বুঝি বই এনেছে। তাই তাকে আর ডাকাডাকি করলেন না। এই ফাঁকে দাদার ঘুম ভাঙ্গলো দাদা বল্লো হয়েছে এখন যা, রুবেল দাদার বিছানার কাছে আত্ববিশ্বাসের সাথে বল্লে দাদা বইগুলো কি নিয়ে যাব?  দাদা বল্লো আরে আজ বই আনিনি কালকে আনবো। রুবেল কান্না ভেজা চোঁখে ঘরথেকে বেরিরিয়ে এলো। তাঁর মা বল্লো বই কোথায়?  রুবেল বল্লো জান মা সামিমের জন্য জুতা এনেছে কিন্তু বই অনেনি.... বলেই হাউমাউ করে সে কি কন্না।তাঁর মা তাকে শান্তনা দিয়ে চুপ করালেন। কিন্তু তার বাবা আসার পর মা তার বাবাকে সবেই বলে দিলো এমনকি বই না আনার পরও অনেক্ষন পা টিপে দেয়ার কথাও। তখন বাবারও রাগ হয়ে হাত-পা বেধে ঘরের মধ্যে খিল দিয়ে রুবেলকে পেটায়। সেদিন থেকে রুবেল আর তার দাদাকে বইয়ের কথা বলেনি। আজ পর্যন্তও রুবেল বই পায়নি।
বই ছাড়াই রুবেল ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা দিলো। কিন্তু ভয়ে তার বাবা-মা কে বইয়ের কথা বলেনি। তখন থেকেই রুবেল ভাবে একেই বলে নিজের আর সৎ! বইয়ের চেয়ে জুতার দরকার অনেক, তাকে বই নিয়ে না দিয়ে তারই সমোবয়সি ও ক্লাসমেট এমন কি চাচাতো ভাইকে জুতা নিয়ে দিল। সেই দূঃখ কষ্ট এখনো রুবেলকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই কথা ভেবে এখনো রুবেল চোঁখের জল ফেলে।
এতো কিছুর পরেও রুবেল পড়াশুনা ছাড়েনি। অনেক কষ্ট করে পড়াশুনাটা চালিয়ে গেছে। কখনো চাঁয়ের দোকানে কাজ করেছে কখনবা পানের দোকানে খেয়ে না খেয়ে পড়াশুনা চালিয়ে গেছে। আজ সামিম প্রতিটি পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করছে কিন্তু রুবেলও কম নয় সে যদিও খারাব করছে তবে সামিমের চেয়ে এক পয়েন্টও কম পেয়ে পাস করছে। এতেই বা কম কিসে?  তফাৎ শুধু এটুকুই। সামিম কোন বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে আর রুবেল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। সামিম যেখানে প্রতি মাসে বাড়ী থেকে দশ হাজারের উপরে টাকা নিচ্ছে সেখানে রুবেল নিজের খরচ নিজে চালিয়ে পরিবারকেও টুকটাক সাহায্য করছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন। ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত দিতে ওয়েব সংস্করন দেখুন।ওয়েব সংস্করনে আরও অনেক কিছু অপেক্ষা করছে।আবারও আপনাকে ব্লগের পক্ষথেকে শুভেচ্ছা। ভাল থাকবেন সব সময়