দুই বছর পর হঠাৎ আরিফের প্রাক্তন স্ত্রী রাইসা ফোন দিল।
স্ক্রিনে নামটা ভেসে উঠতেই আরিফের হাত কেঁপে উঠলো।
“কী দরকার?” গলা যতটা শক্ত করা যায় করলো আরিফ।
ওপাশ থেকে রাইসার গলা ভেজা, প্রায় কান্না মেশানো—
“আরিফ… আমাদের মেয়ে মায়রা। ওর কিডনি ফেইল করছে। ডাক্তার বলেছে বাবা-মায়ের মধ্যে একজনের কিডনি ম্যাচ করলেই বাঁচবে…”
আরিফ এক সেকেন্ড থমকে গেল।
মায়রা? ওর বয়স তো মাত্র 3 বছর। ডিভোর্সের পর আরিফ তো ওকে একবারও দেখেনি।
“আমাকে কেন ফোন করছো? নতুন স্বামীর সাথে তো বেশ সুখেই আছো শুনেছি,” তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো আরিফ।
রাইসা ফুঁপিয়ে উঠলো—
“আরিফ, সত্যি বলছি… মায়রা তোমার মেয়ে না। ও আমার দ্বিতীয় স্বামী নিলয়ের মেয়ে। কিন্তু ডাক্তার বলেছে, তোমার ব্লাড গ্রুপ, টিস্যু টাইপ ওর সাথে 99% ম্যাচ করছে। বিজ্ঞান বলে এটা অসম্ভব… যদি না তুমিই ওর জৈবিক বাবা হও।”
আরিফের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল।
দুই বছর আগে রাইসা নিজে বলেছিল, “আমি আর এই সম্পর্ক টানতে পারবো না। তুমি বন্ধ্যা, আমার বংশ রাখতে পারবে না।”
সেই অপমান নিয়ে আরিফ রাতের ট্রেনে শহর ছেড়েছিল।
আর আজ রাইসা বলছে, মায়রা আরিফের মেয়ে?
“মিথ্যা বলছো তুমি। আমাকে দয়া দেখাতে ডাকছো?”
“আল্লাহর কসম আরিফ, মিথ্যা বলছি না। নিলয়ও জানে। ও নিজেই আমাকে বলেছে তোমাকে ফোন দিতে… কারণ ওর কিডনি ম্যাচ করেনি।”
আরিফ চুপ।
মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে— তাহলে দুই বছর আগে ডিভোর্সের এক সপ্তাহ পর রাইসা গর্ভবতী ছিল কী করে?
“তুমি এখন কোথায়?”
“ঢাকা মেডিকেল। শিশু ওয়ার্ড, বেড নং 12। প্লিজ আরিফ, একবার এসো। মায়রা তোমার নাম ধরে ডাকে ঘুমের মধ্যে।”
ফোন কেটে গেল।
আরিফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকালো। দুই বছর আগে যেই মেয়েটাকে ও ঘৃণা করে চলে এসেছিল, আজ তার ফোন পেয়ে বুকের ভেতরটা কেমন অজানা টানে মোচড় দিচ্ছে।
ঠিক তখনই আরিফের বর্তমান স্ত্রী মেহের রুমে ঢুকলো।
হাতে ডিভোর্সের কাগজ।
“সই করে দাও আরিফ। কাল আমার বোনের বিয়ে। তোমার সাথে আর থাকা সম্ভব না।”
আরিফ কাগজটার দিকে তাকালো।
একদিকে অতীত, একদিকে বর্তমান।
মাঝখানে একটা 3 বছরের বাচ্চা, যার জীবন আরিফের একটা সইয়ের ওপর ঝুলে আছে।
পরদিন সকাল 8টায় আরিফ ঢাকা মেডিকেলের সামনে দাঁড়িয়ে।
হাতে একটা ছোট্ট টেডি বিয়ার।
ওয়ার্ডে ঢুকতেই দেখলো রাইসা। আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছে। পাশে একটা লোক দাঁড়িয়ে— নিলয়। ওর চোখে রাগ আর ভয় মিশে আছে।
আর বেডে… ছোট্ট মায়রা।
ঘুমন্ত মুখটা দেখেই আরিফের বুকের ভেতরটা ফেটে গেল।
কারণ ওর চোখ, নাক, কপাল… সব আরিফের মতো।
রাইসা ফিসফিস করে বলল—
“আরিফ, ডিএনএ রিপোর্ট এসেছে কাল রাতে… রিপোর্ট বলছে মায়রা 100% তোমার মেয়ে।”
ঠিক তখনই মেহের পেছন থেকে বলে উঠলো—
“তাহলে তো ভালোই হলো আরিফ। এখন তুমি যাও, তোমার আসল সংসারে। আমার জীবন থেকে চিরতরে বের হয়ে যাও।”
আরিফ ঘুরে তাকালো।
মেহের চোখে পানি। কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি।
আরিফের মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছে—
মেহের আগে থেকেই সব জানতো?
আর ও কেন চাইছে আরিফ চলে যাক?
ওয়ার্ডের দরজার বাইরে হঠাৎ পুলিশের সাইরেন বাজলো…
পুলিশের সাইরেন শুনে পুরো শিশু ওয়ার্ডে একটা শোরগোল পড়ে গেল।
নার্সরা দৌড়াদৌড়ি করছে, বাচ্চাদের বাবা-মায়ের মুখে আতঙ্ক।
আরিফ পেছন ফিরে দেখলো— দুইজন পুলিশ অফিসার সোজা ওদের দিকেই আসছে।
“আপনি কি আরিফ হোসেন?” সামনের অফিসার জিজ্ঞেস করলো।
আরিফ ঢোক গিললো। “জ্বি… কেন?”
“আপনাকে থানায় যেতে হবে। আপনার বিরুদ্ধে কিডন্যাপিং আর প্রতারণার অভিযোগ আছে।”
রাইসা চিৎকার করে উঠলো, “কী বলছেন আপনি! আরিফ তো এখানে এই প্রথম এসেছে!”
পুলিশ অফিসার ঠান্ডা গলায় বললো, “মিসেস মেহের হোসেনের অভিযোগ— আরিফ দুই বছর আগে ওনার থেকে 20 লাখ টাকা আর গয়না নিয়ে পালিয়ে গেছে। আজ ওনাকে ডিভোর্সের কাগজে সই করানোর চাপ দিচ্ছিল।”
আরিফের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।
মেহের! ও এমন করলো?
মেহের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই একই তৃপ্তির হাসি।
আরিফ তাকাতেই মেহের বললো, “তুমি ভেবেছো আমি কিছু জানি না? তুমি রাইসার সাথে এখনো কন্ট্যাক্টে আছো, আমি সব জানি। তোমাকে এই বাড়িতে আর রাখবো না।”
নিলয় এগিয়ে এসে আরিফের কলার চেপে ধরলো, “তুই আমার মেয়ের জীবন নিয়ে খেলছিস? পুলিশ, ওকে ধরে নিয়ে যাও!”
ঠিক তখনই আইসিইউ থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
“মায়রার অবস্থা খারাপ হচ্ছে! ওর ব্লাড প্রেশার ফল করছে। অপারেশন না করলে আজ রাতেই…”
ডাক্তারের কথা শেষ হওয়ার আগেই মায়রা চোখ মেলে তাকালো।
ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে ফিসফিস করে ডাকলো, “আব্বু…”
পুরো ওয়ার্ড চুপ।
নিলয়ের হাত কেঁপে উঠলো। রাইসার চোখে পানি।
আরিফ পাথর হয়ে গেল।
“মায়রা আমাকে আব্বু বললো… ও জানে আমি কে?” আরিফ ফিসফিস করে বললো।
রাইসা কাঁদতে কাঁদতে বললো, “তুমি যাওয়ার পর থেকে ও প্রতিরাতে তোমার ছবি বুকে নিয়ে ঘুমায়। আমি কখনো বলিনি তুমি ওর বাবা না। বলতে পারিনি…”
মেহের মুখের হাসি মুছে গেল।
ও এগিয়ে এসে ধীরে বললো, “আরিফ, আমি মিথ্যা বলেছি। পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করিনি। আমি শুধু চাইছিলাম তুমি ফিরে না যাও। কারণ আমি ভয় পাচ্ছিলাম… তুমি যদি জানো মায়রা তোমার মেয়ে, তাহলে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”
আরিফ কিছু বলার আগেই ডাক্তার আবার বললো, “সময় নেই! ডোনার রেডি না হলে মায়রাকে বাঁচানো যাবে না। আরিফ সাহেব, আপনি কি কিডনি দেবেন?”
আরিফ একবার মেহের দিকে তাকালো।
একবার রাইসার দিকে।
আর একবার ছোট্ট মায়রার দিকে, যে এখনো ওর হাতটা ধরে আছে।
“দেবো,” আরিফ বললো। “আমার মেয়ের জন্য আমি সব দেবো।”
অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হলো। লাল বাতি জ্বলে উঠলো।
বাইরে করিডোরে তখন তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
রাইসা, মেহের আর নিলয়।
তিনজনের চোখেই পানি।
কিন্তু কারণ তিনজনের আলাদা।
দুই ঘণ্টা পর নার্স বেরিয়ে এসে বললো, “অপারেশন সাকসেসফুল। কিন্তু…”
সবার বুক ধক করে উঠলো।
“কিন্তু কী?” আরিফ চিৎকার করে উঠলো।
নার্স ধীরে বললো, “আরিফ সাহেবের শরীরে একটা রিপোর্ট মিলেছে। যেটা আমরা গতকাল রাইসা ম্যাডামের ফাইলে দেখেছি।”
“কী রিপোর্ট?”
“মায়রার বায়োলজিকাল মা রাইসা না।”
কথাটা শুনে করিডোরে যেন বাজ পড়লো।
রাইসা পিছিয়ে গেল।
নিলয়ের মুখ ফ্যাকাশে।
আর মেহের ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো।
*চলবে…*




