শেষ চিঠি

বিকেলের শেষ আলোটা নদীর জলে পড়ে চিকচিক করছিল। গ্রামের ছোট্ট ডাকঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রফিক। হাতে একটি পুরোনো খাম। খামের কোণগুলো হলদেটে হয়ে গেছে, যেন অনেক দিনের অপেক্ষার সাক্ষী।
রফিক এই চিঠিটা পেয়েছে তার দাদার পুরোনো ট্রাঙ্কে। ট্রাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎই চোখে পড়ে খামটা। উপরে লেখা ছিল, "যদি কখনো আমার কথা জানতে ইচ্ছে করে, তবে এই চিঠি পড়বে।"
দাদা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। জীবিত অবস্থায় তিনি খুব কম কথা বলতেন। পরিবারের সবাই জানত, তরুণ বয়সে তিনি শহরে কাজ করতেন। কিন্তু তার জীবনের অনেক গল্পই অজানা রয়ে গেছে।
রফিক ধীরে ধীরে খাম খুলল।
চিঠির প্রথম লাইনেই লেখা ছিল,


"প্রিয় নাতি,
যখন তুমি এই চিঠি পড়বে, আমি হয়তো আর থাকব না। তাই কিছু কথা লিখে রেখে গেলাম।"
রফিকের বুক কেঁপে উঠল।
চিঠিতে দাদা লিখেছিলেন তার যৌবনের কথা। কিভাবে দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে শহরে কাজ করতে যেতে হয়েছিল। দিনে ইট ভাঙার কাজ, রাতে রেলস্টেশনের বেঞ্চে ঘুম। কত অপমান, কত কষ্ট সহ্য করেছেন, তার হিসাব নেই।
এক জায়গায় লেখা ছিল,
"অনেকবার হেরে যেতে চেয়েছিলাম। মনে হতো জীবনটা বুঝি এখানেই শেষ। কিন্তু প্রতিবার তোমার দাদির মুখটা মনে পড়ত। তখন আবার উঠে দাঁড়াতাম।"
রফিক পড়তে পড়তে অনুভব করল, তার চোখ ভিজে যাচ্ছে।
চিঠির পরের অংশে ছিল আরও বিস্ময়কর একটি ঘটনা।
দাদা একবার বড় অঙ্কের টাকা ভর্তি একটি ব্যাগ কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। তখন তার নিজের পকেটে মাত্র দশ টাকা ছিল। কয়েকদিন ঠিকমতো খেতেও পারেননি। তবু তিনি ব্যাগটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
মালিক বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমি টাকা নিলে না কেন?"
দাদা উত্তর দিয়েছিলেন,
"অভাব আমার চরিত্র কেড়ে নিতে পারেনি।"
এই কথাটা পড়ে রফিক দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
চিঠির শেষ অংশে দাদা লিখেছিলেন,
"জীবনে বড় মানুষ হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া বেশি কঠিন। মানুষ তোমার অর্থ ভুলে যাবে, পদ ভুলে যাবে, কিন্তু তোমার ব্যবহার ভুলবে না।"
আরও লেখা ছিল,
"যদি কখনো পথ হারিয়ে ফেলো, নিজের বিবেককে প্রশ্ন করো। সে কখনো ভুল উত্তর দেবে না।"
চিঠি শেষ হয়ে গেছে।
রফিক ধীরে ধীরে কাগজটা ভাঁজ করল। নদীর ওপারে সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে। চারদিকে নরম অন্ধকার নেমে এসেছে।
সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, দাদা তাকে কোনো সম্পত্তি দিয়ে যাননি, কোনো ধন-সম্পদও না। কিন্তু তার চেয়ে মূল্যবান কিছু দিয়ে গেছেন।
জীবনকে সৎভাবে বাঁচার শিক্ষা।
রফিক আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
মনে হলো, কোথাও না কোথাও দাদা হয়তো তাকিয়ে আছেন। আর বলছেন,
"মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচিস।"
নদীর জলে তখন শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রফিকের মনে যেন নতুন এক আলো জ্বলে উঠেছে।

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন