ছায়ার স্বাক্ষর -পর্ব ৩

অচেনা বোন

১ বছর পর…  

মায়রার ৫ম জন্মদিন। ঢাকার এক নামী স্কুলের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান চলছে।  
স্টেজে মায়রা ছোট্ট ফ্রক পরে নাচছে। দর্শক সারিতে বসে আরিফ, রাইসা আর মেহের—তিনজনেই হাসিমুখে ভিডিও করছে।  

দুই বছর আগের সেই তিক্ততা এখন শুধুই স্মৃতি।  
আজ ওরা তিনজন একসাথে মায়রার বাবা-মা।  

নাচ শেষে মায়রা দৌড়ে এসে তিনজনের গলা জড়িয়ে ধরলো,  
"আজ আমি সবচেয়ে সুখী বাচ্চা!"

অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন বাইরে বের হচ্ছে, তখনই গেটের কাছে দাঁড়িয়ে একটা ১২-১৩ বছরের মেয়ে।  
গায়ে পুরনো স্কুল ড্রেস, হাতে একটা ছেঁড়া খাম।  
চোখে অদ্ভুত এক চাহনি।  

মায়রা ওকে দেখে থমকে গেল।  
"তুমি কে?"  

মেয়েটা ধীরে এগিয়ে এলো।  
ওর চোখ মায়রার চোখের মতো। নাক, ঠোঁট—সব মিলে যায়।  

"আমি নীলা," মেয়েটা বললো।  
"তুমি কি মায়রা? আমি তোমার বোন হই…"

পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ।  
আরিফ, রাইসা, মেহের—তিনজনেই পাথর হয়ে গেল।  

"বোন?" মেহের ফিসফিস করে বললো।  
"কার বোন?"

নীলা খামটা এগিয়ে দিলো আরিফের দিকে।  
"এই চিঠিটা আমার মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, তোমরা যদি কোনোদিন আমাকে খুঁজো, এই চিঠি দিয়ে দিও।"

আরিফ কাঁপা হাতে খাম খুললো।  
ভেতরে একটা পুরনো ডিএনএ রিপোর্ট আর একটা চিঠি।  

চিঠিতে লেখা—  
_"আরিফ, আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো। তানিয়া মারা যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেছে সব সত্যি। মায়রা একা না। তোমার আরেকটা মেয়ে আছে—নীলা। ওর জন্মের সময় আমি ডাক্তারকে টাকা দিয়ে রিপোর্ট বদলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি জানতে না পারো। ক্ষমা করো আমাকে। নীলাকে দেখো। ও তোমার রক্ত।"_  
— তানিয়া রহমান

পুরো নামটা শুনেই আরিফের পা কেঁপে উঠলো।  
তানিয়া… সাব্বিরের প্রথম স্ত্রী।  
যে দুই বছর আগে হাসপাতালে বলেছিল, "ওই ছেলে বাঁচলে আমার মেয়ে মারা যাবে!"

মেহের চিৎকার করে উঠলো,  
"তানিয়া মারা গেছে! তাহলে নীলা এখন কোথায় থাকতো?"

নীলা মাথা নিচু করে বললো,  
"মা মারা যাওয়ার পর আমি এতিমখানায় ছিলাম। আজ শুনলাম মায়রার জন্মদিন। তাই চলে এলাম… যদি আমার আব্বু আমাকে চেনে।"

রাইসা দৌড়ে গিয়ে নীলাকে জড়িয়ে ধরলো।  
"তুমি আমাদের মেয়ে নীলা। আজ থেকে তুমি আর একা না।"

আরিফ নীলার দিকে তাকিয়ে আছে।  
ওর চোখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।  
ঠিক মায়রার মতো চোখ।  

কিন্তু প্রশ্ন একটাই—  
তানিয়া মারা যাওয়ার আগে কেন এই সত্যি লুকিয়ে রেখেছিল?  
আর নীলাকে এতিমখানায় কে পাঠিয়েছিল?  

ঠিক তখনই ভিড়ের ভেতর থেকে একটা ছায়া সরে গেল।  
দূরে দাঁড়িয়ে একজন লোক সব দেখছে।  
হাতে একটা ফাইল।  
ফাইলের ওপরে লেখা— *"প্রজেক্ট নীলা – গোপন"*

লোকটা ফিসফিস করে বললো,  
"খেলা এখন শুরু হলো আরিফ হোসেন।"

 "প্রজেক্ট নীলা"*

নীলার কথা শুনে পুরো জায়গাটা থমকে গেল।  
রাইসা তো কেঁদেই ফেললো, মেহের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।  
আরিফ শুধু নীলার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার চোখে সেই একই কষ্ট—যা ও দুই বছর আগে নিজের চোখে দেখেছিল।

"তুমি সত্যি বলছো তো নীলা?" আরিফের গলা ধরে এলো।  
নীলা মাথা নিচু করে বললো, "মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে শুধু এই চিঠিটাই দিয়েছিল। বলেছিল, যদি কোনোদিন সুযোগ পাই, তোমার কাছে চলে আসতে।"

মেহের এগিয়ে এসে নীলার কাঁধে হাত রাখলো, "চলো মা, আগে বাড়ি চলো। বাকি কথা সেখানে হবে।"

কিন্তু যেই ওরা গাড়ির দিকে পা বাড়ালো, অমনি ভিড়ের ভেতর থেকে সেই ছায়ামূর্তিটা আবার নড়ে উঠলো।  
লোকটা দ্রুত সরে গেল, কিন্তু আরিফ দেখে ফেললো।  
হাতে সেই ফাইল—"প্রজেক্ট নীলা – গোপন"।

"থামো!" আরিফ চিৎকার করে ছুটলো।  
লোকটা ভিড় ঠেলে দৌড় দিলো।  
আরিফও পেছনে।  

স্কুলের গেটের বাইরে এসে লোকটা একটা কালো গাড়িতে উঠে পড়লো।  
আরিফ দৌড়ে গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই গাড়িটা সাঁ করে বেরিয়ে গেল।  
শুধু গাড়ির নাম্বারটা মনে রাখতে পারলো আরিফ।

বাড়ি ফিরে সবাই বসে পড়লো ড্রয়িংরুমে।  
নীলা চুপ করে বসে আছে, মায়রা ওর হাত ধরে বসে আছে।  
যেন দুই বোন জন্ম থেকেই একে অপরকে চেনে।

আরিফ চিঠিটা আবার পড়লো।  
"তানিয়া মারা যায়নি। ওকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে… প্রজেক্ট নীলার জন্য।"

"প্রজেক্ট নীলা?" রাইসা ফিসফিস করলো।  
"এটা কী?"


মেহের ফোন বের করে এক পুরনো ডাক্তারকে কল দিলো।  
"হ্যালো ড. কামাল? আমি মেহের হোসেন বলছি। আপনার কাছে একটা রিপোর্ট আছে—প্রজেক্ট নীলা।"

ওপাশ থেকে ডাক্তার চুপ।  
তারপর ধীরে বললো, "মেহের ম্যাডাম, এই ফাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না। আপনারা বিপদে পড়বেন।"

"বিপদ? আমার মেয়েরা বিপদে আছে!" মেহের চিৎকার করে উঠলো।  

ডাক্তার ফিসফিস করে বললো, "তানিয়া মারা যায়নি। ওকে একটা প্রাইভেট ল্যাবে রাখা হয়েছে। ওর ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছে। আর নীলা… নীলা সেই এক্সপেরিমেন্টের প্রথম সাকসেস। ওর জিনে কিছু একটা আছে, যা রেয়ার ব্লাড ডিজ সারাতে পারে।"

পুরো ঘর চুপ।  
আরিফের মাথা ঘুরছে।  

"মানে… আমার মেয়েকে দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে?" আরিফ দাঁতে দাঁত চেপে বললো।  

ডাক্তার বললো, "আরিফ সাহেব, ওরা এখন নীলাকে খুঁজছে। ওকে পেলে আবার নিয়ে যাবে। আপনি ওকে লুকিয়ে রাখুন। আমি কাল দেখা করছি।"

ফোন কেটে গেল।  

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির হর্ন।  
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে, সেই কালো গাড়িটা বাইরে দাঁড়িয়ে।  

আর গাড়ির ভেতর থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো—  
"আরিফ… আমি ফিরে এসেছি।"

সবাই জানালার দিকে তাকালো।  
গাড়ির কাঁচ নেমে গেল।  

ভেতরে বসে আছে তানিয়া।  
ফ্যাকাশে, শুকনো, কিন্তু জীবিত।  

আর ওর পাশে বসে আছে সাব্বির।  
হাতে হাতকড়া নেই। চোখে সেই পুরনো অহংকার।  

তানিয়া হেসে বললো,  
"নীলা… মা এসেছে রে মা।"

নীলা চিৎকার করে উঠলো, "মা!"

কিন্তু ওর চোখে ভয়।  
কারণ তানিয়ার চোখে কোনো মায়া নেই। শুধু একটা ঠান্ডা হিসাব।

আরিফ বুঝে গেল—  
এটা শেষ না।  
এটা শুধু শুরু।

*চলবে 

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন