"মায়রার বায়োলজিকাল মা রাইসা না।"
নার্সের মুখ থেকে কথাটা বের হতেই পুরো করিডোরে পিনপতন নীরবতা।
রাইসা দুই পা পিছিয়ে গেল, যেন মাটি ওর পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে।
নিলয়ের হাত কাঁপছে।
আর মেহের… ওর ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি আরও চওড়া হলো।
"মানে?" আরিফের গলা ফেটে গেল।
"মানে মায়রার ডিএনএ রিপোর্টে মায়ের সাইড ম্যাচ করেনি রাইসার সাথে। কিন্তু বাবার সাইড ১০% ম্যাচ করেছে আপনার সাথে," নার্স ধীরে বললো।
রাইসা ছুটে এসে নার্সের হাত চেপে ধরলো, "এটা সম্ভব না! মায়রা আমার পেটে ৯ মাস ছিল! আমি ওকে জন্ম দিয়েছি!"
নার্স মাথা নাড়লো, "ম্যাডাম, সারোগেসি বা এগ ট্রান্সপ্লান্টের কেসে এমন হয়। বাচ্চা আপনার গর্ভে বড় হয়েছে, কিন্তু ডিম্বাণু অন্য কারো।"
ঠিক তখনই আইসিইউ-এর দরজা খুলে গেল।
মায়রাকে বের করে আনা হচ্ছে।
ছোট্ট মেয়েটা এখনো ঘুমিয়ে। মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু নিঃশ্বাস স্থির।
আরিফ দৌড়ে গেল।
"মায়রা…"
ডাক্তার বললো, "অপারেশন সাকসেসফুল। ৭২ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখতে হবে। আর হ্যাঁ, আমরা মায়রার ব্লাড স্যাম্পল রি-চেক করেছি। ওর ব্লাড গ্রুপ O নেগেটিভ।"
নিলয় চমকে উঠলো।
"ও নেগেটিভ! কিন্তু আমার তো A পজিটিভ! রাইসার B পজিটিভ!"
আরিফের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
ও নেগেটিভ… ওর নিজেরও তো O নেগেটিভ।
মেহের ধীরে এগিয়ে এলো।
ওর চোখে এখন আর ভয় নেই। শুধু একটা অদ্ভুত শান্তি।
"আরিফ," মেহের ডাকলো।
সবাই ওর দিকে তাকালো।
"তুমি জিজ্ঞেস করছিলে না আমি কেন চাইছিলাম তুমি চলে যাও? কারণ আমি জানতাম… মায়রা আমার মেয়ে।"
বোমা ফাটলো।
"কী বলছো তুমি!" রাইসা চিৎকার করে উঠলো।
"দুই বছর আগে তোমাকে ডিভোর্স দেওয়ার এক সপ্তাহ পর রাইসা আমার কাছে এসেছিল," মেহের বলতে শুরু করলো।
"ও কাঁদছিল। বলছিল ওর গর্ভে বাচ্চা আসছে, কিন্তু ওর স্বামী সাব্বির ওকে মেরে ফেলবে যদি জানে বাচ্চাটা তোমার। কারণ সাব্বির ভাবতো তুমি বন্ধ্যা।"
আরিফের মাথা ঘুরছে।
"তাহলে?"
"রাইসা বলেছিল ওর বাচ্চা বাঁচাতে হবে। ওর শরীরে প্রবলেম ছিল, ও নিজে বাচ্চা রাখতে পারবে না। তাই ও আমার ডিম্বাণু নিয়েছিল… আইভিএফ করে। শর্ত ছিল একটাই— আমি কখনো মা-মেয়ের পরিচয় দাবি করতে পারবো না।"
রাইসা ফুঁপিয়ে উঠলো, "আমি… আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম আরিফ। সাব্বির জানলে তোকে খুন করতো।"
মেহের তাকালো আরিফের দিকে।
"আমি দুই বছর ধরে মা হয়েও মা হতে পারিনি। দূর থেকে মায়রাকে দেখেছি, ওর জন্মদিনে লুকিয়ে কেক পাঠিয়েছি। আজ যখন শুনলাম মায়রা মারা যাবে, আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না।"
নিলয় রেগে গিয়ে মেহের কলার চেপে ধরলো, "তুই এতদিন চুপ ছিলি কেন! আমার মেয়েকে নিয়ে খেলছিস!"
"তোমার মেয়ে?" মেহের হাসলো।
"ডিএনএ রিপোর্ট দেখো নিলয়। মায়রা তোমার মেয়ে না। ও আরিফ আর আমার মেয়ে।"
নিলয়ের হাত থেকে কলার ছুটে গেল।
ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো মেঝেতে।
আরিফ কিছু বলতে পারছে না।
একদিকে রাইসা, যে ওকে বাঁচাতে মিথ্যা বলেছে।
অন্যদিকে মেহের, যে ওকে ভালোবেসে সব ছেড়ে দিতে চাইছে।
মাঝখানে মায়রা, যার জন্য ও আজ জীবন দিতেও রাজি।
ঠিক তখনই করিডোরের শেষ মাথায় একটা ছায়া নড়ে উঠলো।
সাব্বির দাঁড়িয়ে।
চোখ লাল, হাতে পিস্তল।
"তোরা সবাই মিলে আমার সাথে এত বড় খেলা খেললি?" সাব্বির গর্জে উঠলো।
"আরিফ, আজ তুই মরবি। আমার বাচ্চা নিয়ে তুই সুখ করবি, তা হবে না!"
পিস্তল তাক করলো আরিফের দিকে।
সাব্বিরের হাতে পিস্তল দেখে পুরো করিডোর জমে গেল।
নার্স, ডাক্তার, রোগীর আত্মীয়—সবাই ছুটে পালাতে লাগলো।
"সাব্বির! পিস্তল নামাও!" রাইসা চিৎকার করে উঠলো।
ওর গলা কাঁপছে, কিন্তু চোখে ভয় নেই। শুধু মায়ার জন্য আকুতি।
সাব্বির হাসলো। সেই হাসিতে দুই বছরের জমে থাকা ঘৃণা।
"নামাবো? যেই আরিফের জন্য তুই আমাকে ছেড়ে গেলি, সেই আরিফ আজ আমার মেয়ের বাবা সাজছে? কখনো না!"
পিস্তল আরিফের কপালে তাক করা।
আরিফ একবার মায়রার দিকে তাকালো। আইসিইউ-এর কাঁচের ওপাশে ছোট্ট মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে।
ওর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। যেন বলছে, "আব্বু, ভয় পেয়ো না।"
আরিফ ধীরে এগিয়ে গেল।
"গুলি কর সাব্বির। আমাকে মেরে ফেললে মায়রার কী হবে? ওর তো আর কেউ থাকবে না।"
"থাকবে! আমি আছি! আমি ওর আসল বাবা!" সাব্বির চিৎকার করলো।
"তুমি?" মেহের এগিয়ে এলো।
"তুমি দুই বছর আগে যাকে রাস্তায় বের করে দিয়েছিলে, আজ তাকে বাবা বলছো? সাব্বির, মায়রা যদি জানতে পারে তুমি ওর আসল বাবাকে মারতে এসেছো, ও তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।"
সাব্বিরের হাত কাঁপছে।
ওর চোখে রাগের সাথে একটা অদ্ভুত অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পুলিশের গলা ভেসে এলো—
"হাত ওপরে তোলো! নড়বে না!"
দুইজন পুলিশ ছুটে এসে সাব্বিরকে ঘিরে ধরলো।
পিস্তলটা পড়ে গেল মেঝেতে।
সাব্বির হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।
"আমি ভুল করেছি… আমি ভুল করেছি…" ও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
"আমি ভেবেছিলাম আরিফ বন্ধ্যা। আমার মা বলেছিল ও কখনো বাবা হতে পারবে না। তাই আমি রাইসাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ জানলাম, সমস্যা আমার ছিল… আমার রিপোর্ট বদলানো হয়েছিল।"
রাইসা থমকে গেল।
"মানে… তুমি জানতে না?"
সাব্বির মাথা নিচু করলো।
"না। মা আর তানিয়া মিলে রিপোর্ট বদলেছিল। ওরা চাইছিল আমি তানিয়ার বোনকে বিয়ে করি।"
করিডোরে আবার নীরবতা।
এত বছর ধরে যে ঘৃণা, যে ভুল বোঝাবুঝি—সব এক মুহূর্তে ভেঙে পড়লো।
পুলিশ সাব্বিরকে নিয়ে যাওয়ার সময় আরিফ একবার ডাকলো,
"সাব্বির।"
সাব্বির ফিরে তাকালো।
চোখে পানি।
"মায়রাকে দেখো। ওর জন্য বেঁচে থাকো। ভুল শোধরানোর সুযোগ পাবে," আরিফ বললো।
সাব্বির কিছু বললো না। শুধু মাথা নাড়লো।
---
১ ঘণ্টা পর।
আইসিইউ-এর দরজা খুললো।
ডাক্তার হেসে বললো, "মায়রা এখন বিপদমুক্ত। ২৪ ঘণ্টা পর কেবিনে শিফট করা হবে।"
সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
রাইসা কাঁদতে কাঁদতে আরিফের হাত ধরলো,
"আমাকে ক্ষমা করো আরিফ। আমি ভয় পেয়েছিলাম… তুমি যদি ফিরে এসে মায়রাকে নিয়ে যাও।"
আরিফ ধীরে বললো,
"মায়রা কারো একার না রাইসা। ও আমাদের তিনজনের। তুমি ওর মা, মেহেরও ওর মা। আমি শুধু চাই ও সুস্থ থাকুক, হাসিখুশি থাকুক।"
মেহের চুপ করে শুনছিল।
ওর চোখে পানি।
ও এগিয়ে এসে রাইসার হাত ধরলো।
"আমরা ঝগড়া করবো না রাইসা। মায়রার জন্য আমরা এক হবো।"
রাইসা অবাক হয়ে তাকালো।
এই মেয়েটা, যাকে ও শত্রু ভাবতো, আজ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই কেবিনের ভেতর থেকে মায়রা ডাকলো—
"আব্বু… আম্মু…"
তিনজন একসাথে ছুটে গেল।
কাঁচের ওপাশে মায়রা হাসছে।
একদিকে আরিফ, একদিকে রাইসা, আরেকদিকে মেহের।
তিনজনেই ওর হাত ধরলো।
বাইরে সূর্য উঠছে।
দুই বছরের অন্ধকার কেটে গিয়ে নতুন ভোর হলো।
☞ গল্প এখানেই শেষ না… 👀
১ বছর পর মায়রার স্কুলের ফাংশনে একটা অচেনা মেয়ে এসে বললো,
"তুমি কি মায়রা? আমি তোমার বোন হই…"
আসছে মায়ারা পর্ব




