সবার স্বপ্ন বাড়ী যায় না

 ঈদের সকাল। শহরের আকাশটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা লাগছে আজ। সাধারণত এই দিনটায় রাস্তায় মানুষের ভিড় থাকে, নতুন কাপড়ের গন্ধে বাতাস ভরে যায়, ছোটদের চিৎকারে চারপাশ সরগরম হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ রাশেদের কাছে সবকিছুই নিস্তব্ধ।

ছোট্ট এক রুমে বসে আছে সে। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে। দূরে কোথাও মসজিদের মাইকে তাকবির ভেসে আসছে—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…”। এই শব্দটা শুনলেই তার মনে পড়ে যায় গ্রামের সেই বড় মসজিদটা, যেখানে বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যেত সে।

এইবারও যাওয়ার কথা ছিল। মা আগেই বলে রেখেছিলেন, “এইবার কিন্তু না এসে পারবা না রে, তোর জন্য পছন্দ করে পাঞ্জাবি কিনে রাখছি।” ছোট বোনটা প্রতিদিন ফোন দিয়ে বলত, “ভাইয়া, তাড়াতাড়ি আসবা কিন্তু, আমরা একসাথে সেমাই খাবো।”

কিন্তু সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেল।

অফিসে হঠাৎ করে একটা জরুরি প্রজেক্ট পড়ে গেল। ছুটি পাওয়া গেল না। প্রথমে ভেবেছিল একদিনের জন্য হলেও যাবে, কিন্তু পরে বুঝল, সেটা সম্ভব না। টিকিটও পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত ফোন করে বলতেই হলো—“মা, এইবার আসতে পারব না…”

ওপাশে কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর মা শুধু বললেন, “ঠিক আছে বাবা, কাজ তো আগে। সাবধানে থাকিস।”

কিন্তু সেই “ঠিক আছে”-এর ভেতরে যে কতটা কষ্ট লুকানো ছিল, সেটা রাশেদ খুব ভালো করেই বুঝেছিল।

ঈদের আগের রাতে সে ঘুমাতে পারেনি ঠিকমতো। ফেসবুকে সবাই গ্রামের ছবি দিচ্ছে—নতুন জামা, কোলাকুলি, রান্নার ছবি। বন্ধুদের কেউ লিখেছে, “বাড়ির মতো শান্তি আর কোথাও নেই।”

এই লাইনটা পড়েই বুকটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠল।

সকালে উঠে নিজের জন্য কেনা নতুন পাঞ্জাবিটা পরল সে। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো, সব ঠিক আছে। কিন্তু ভেতরে একটা শূন্যতা রয়ে গেল।

নামাজে গেল কাছের মসজিদে। সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, “ঈদ মোবারক” বলছে। রাশেদও বলল, হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না।

নামাজ শেষে ফোনটা বের করল। মায়ের ভিডিও কল।

রিসিভ করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল পরিচিত উঠানটা। মা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, বোনটা নতুন জামা পরে হাসছে, বাবা চুপচাপ বসে আছেন চেয়ারে।

“ঈদ মোবারক, বাবা,” মা বললেন।

রাশেদ জোর করে হাসল, “ঈদ মোবারক, মা।”

বোনটা বলল, “ভাইয়া, দেখো আমি কী সুন্দর জামা পরছি!”

“খুব সুন্দর লাগছে,” রাশেদ বলল।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার চোখে পানি চলে এলো। সে দ্রুত মুখটা ঘুরিয়ে নিল, যাতে কেউ না দেখে।

মা যেন বুঝে ফেললেন। নরম গলায় বললেন, “কাঁদিস না রে। সামনে তো অনেক ঈদ আছে।”

রাশেদ কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে হাসল।

কলটা শেষ হওয়ার পর সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে বাচ্চারা খেলছে, কেউ আতশবাজি ফাটাচ্ছে, কেউ নতুন সাইকেল চালাচ্ছে।

হঠাৎ মনে হলো, ঈদ আসলে শুধু নতুন জামা বা ভালো খাবার না। ঈদ মানে একসাথে থাকা, প্রিয় মানুষগুলোর কাছে থাকা।

আর আজ, সেই জায়গাটাই খালি।

রাশেদ গভীর একটা শ্বাস নিল। নিজের মনেই বলল,

“আগামী ঈদে যাই হোক, আমি বাড়ি যাবোই।”

তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এসে টেবিলের ওপর রাখা সেমাইয়ের বাটিটা হাতে নিল। একা বসে খেতে শুরু করল।


স্বাদ ঠিকই আছে…

কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে, কিছু একটা কম আছে।

হয়তো সেটা ঘরের গন্ধ।

হয়তো মায়ের হাতের ছোঁয়া।

হয়তো… বাড়ি।

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন